/ / BENGALI LOVE STORY - ' মনের আয়না '

BENGALI LOVE STORY - ' মনের আয়না '





-- "বলছি লজ্জা পেয়ে কি লাভ,শুতেই যখন হবে আমার সাথে!"


সৌমিক কথা টা বলেই, ছিটকিনি তুলে দিল। সামনে ফুলশয্যার খাটে,বসে আছে পূর্বাশা। চোখের দৃষ্টিতে চূড়ান্ত বিস্ময়। সে ঠিক শুনছে তো! সৌমিক ততক্ষণে ওর ঠিক পাশে এসে বসেছে।তার দুচোখ পূর্বাশাকে চেখে নিচ্ছে আপাদমস্তক। সৌমিক যদিও ওর স্বামী, তাদের বৌভাত হয়ে গেল আজকে, তবুও কেন জানিনা পূর্বাশার সৌমিকের এই তাকানো টা ভালো লাগল না। সৌমিক অদ্ভুত একরকমের হাসি দিয়ে উঠে গেল বিছানা থেকে। ঘরের অন্যদিকে একটা আলমারি আছে, পূর্বাশার বাবা ই যৌতুক হিসেবে দিয়েছে। সৌমিক আলমারি টা খুলে তার ভিতর থেকে কালো রঙের ট্রান্সপারেন্ট একটা নাইটি এনে পূর্বাশার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল….


-- "বাথরুমে গিয়ে চেঞ্জ করে নাও। এইটা আমি কিনে রেখেছি তোমার জন্য।" 


পূর্বাশার বিস্ময় এর ঘোর যেন কাটতেই চায়না। মনে মনে ভাবতে থাকে এটা কোথায় এসে পড়ল সে! বাবা সম্বন্ধটা নিয়ে পূর্বাশার কাছে এসে বলেছিল…..


--"এর সাথে তোর সম্বন্ধ ঠিক করে এলাম। ছেলেটা বেশ ভালো। ব্যাঙ্কে চাকরি করে।ভালো মাইনে।দেখতেও ভালো।"।  


আর বিশেষ কিছু বলার প্রয়োজন বোধ করেনি তার বাবা। ভালো ছেলে হতে এই দুটো গুন ই লাগে বলে তাঁর ধারণা। পূর্বাশা কলেজে পড়াকালীন সঞ্জয় বলে একটা ছেলে কে পছন্দ করত, মুখে কোনোদিনও যদিও কিছু বলতে পারেনি। সঞ্জয় ছেলেটা একটু অন্যরকম ছিল। অসম্ভব সুন্দর গান করতো । ফটোগ্রাফির ভীষণ শখ । বড়ো ফটোগ্রাফার হওয়ার স্বপ্ন দেখতো সে । কলেজে পড়াকালীন পূর্বাশার অনেক ছবি তুলে দিয়েছিল ।এমনকি সেকেন্ড ইয়ারে পড়ার সময় সঞ্জয় কলেজের ক্যান্টিনে সবার সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে ফিল্মি কায়দায় পূর্বাশা কে প্রপোজও করেছিল। পূর্বাশার মুখ সেদিন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কোনো কথা না বলে সে এক ছুটে বেরিয়ে গিয়েছিল ক্যান্টিন থেকে।


প্রেমকে ঠেকানো যায়,ভালোবাসাকে যায় না। সঞ্জয়ের ওই শান্ত দুটি চোখের সামনে গেলেই পূর্বাশার বুক কেঁপে উঠত। মুখে সে কোনোদিন কিচ্ছু বলতে পারেনি সঞ্জয়কে। বনেদী বাড়ির মেয়ে পূর্বাশা । পাড়ার লোকে ওর বাবাকে একনামে চেনে। মেয়ে প্রেম করছে,তাও আবার একজন বেকার - ফটোগ্রাফার এর সঙ্গে এটা বাবা কোনোদিনও মেনে নেবেন না,সেটা পূর্বাশা জানত। প্রেম করে বিয়ে করাটা দৃষ্টিকটু, তাদের বংশে কেউ কোনোদিনও প্রেম করে বিয়ে করেনি,করবেও না। সেই সাহস কেউ দেখায়নি আজ পর্যন্ত । আর সেই সাহস যদি সে দেখাতে যায় তাহলে তার বাবা সঞ্জয়ের অনেক বড়ো ক্ষতি করে দেবে…..এরকমই একটা ধারণার বশবর্তী ছিল পূর্বাশা । পূর্বাশার বাবা কৃষ্ণচরণ বাবু। মেয়েকে তিনি অসম্ভব শাসনের মধ্যেই রেখেছেন ছোটবেলা থেকে। কখনো কোনোকিছুর অভাব রাখেন নি । কিন্তু মেয়ের নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে নিজস্ব কোনো মত থাকতে পারে আর সেটা বাবা হোয়ে তার একটু ভেবে দেখা উচিত সেটা কখনো মনেও আনেন নি । মেয়েকে কলেজেও পাঠিয়েছিলেন শুধু মাত্র ডিগ্রিপ্রাপ্ত উচ্চশিক্ষিতা বিবাহযোগ্য পাত্রী তৈরি করতে। পূর্বাশা জানত প্রতিবাদ তার রক্তে নেই। তাই সে মাথা নীচু করে সবকিছু মেনে এসেছে চিরকাল। সঞ্জয়কে তাই তার মনের কথা মুখ ফুটে বলতে পারেনি কোনোদিন। আবার তার দুর্নিবার আকর্ষণকেও অগ্রাহ্য করতে পারেনি পূর্বাশা । ছেলেটার চোখে এক অদ্ভুত সততা ছিল,আর সেই দিক থেকে জোর করেও চোখ ফেরানো যায় না। 


তবে একবার কাউকে না জানিয়ে সঞ্জায়দের বাড়ি গিয়েছিল পূর্বাশা । সঞ্জয়ের অনুরোধেই অবশ্য। সঞ্জয়ের বাড়ির দোতলার একটা ঘরে স্টুডিও আছে, ওর নিজের। সেই স্টুডিওর দেওয়ালে নিজের ছবির পর ছবি সযত্নে সাজানো দেখে সেদিন কেঁদেই ফেলেছিল পূর্বাশা। ভাঙা ভাঙা গলায় জিজ্ঞাসা করেছিল….


--"এগুলো এখানে এভাবে কেন?"


ওপাশ থেকে সঞ্জয় বলেছিল….


--" ভালোবাসি তাই "


পূর্বাশা এক ছুটে বেরিয়ে যেতে গেলে সঞ্জয় ওর হাত ধরে বলেছিল….


-- "অন্তত একদিন থাকো আমার কাছে।" 


গলার স্বরে এমন কাতরতা ছিল, পূর্বাশা আর নড়তে পারেনি এক পাও । কেবল অস্ফুটে বলেছিল….


-- "বাড়ি থেকে আমার সম্বন্ধ দেখে নিয়েছে। গ্র‍্যাজুয়েশন হয়ে গেলেই আমার বিয়ে দিয়ে দেবে।"


মাথা নামিয়ে সম্রাট বলেছিল….


--"জানি। সৌমিক চৌধুরী। ব্যাঙ্কে কাজ করে। তোমাকে হয়ত অনেক ভালো রাখবে।তবে আমার মতো ভালোবাসতে পারবেনা।"


পূর্বাশার নিজের ও কেন জানেনা সেদিন মনে হয়েছিল, কথাগুলো অদ্ভুত রকমের সত্যি। সঞ্জয় পূর্বাশার হাত ধরে বলেছিল….


--"তোমার কাছে আজ প্রথম এবং শেষ বারের মত একটা কিছু চাইলে দেবে!"


পূর্বাশা যন্ত্রের মতো মাথা নেড়েছিল। সঞ্জয় পূর্বাশার কোলের কাছে বসে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিল," এই একটা দিনের জন্য আমার হবে!" 


জড়িয়ে ধরেছিল পূর্বাশা। মিনিট পনেরো সঞ্জয়কে ওভাবে জড়িয়েই কেঁদেছিল। সঞ্জয় ও পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়েছিল । কোনো কথা সরেনি তার মুখ দিয়ে ও । শুধু চুপ করে পূর্বাশার মাথায় হাত বুলিয়ে গেছে । পূর্বাশার মনে আছে, সেদিন সঞ্জয় ওর গিটারে একটা অদ্ভুত মায়া সৃষ্টি করে পরিষ্কার অথচ অবসন্ন গলায় গেয়েছিল…….


" যদি আর কারে ভালোবাসো...
যদি আর ফিরে নাহি আসো…
তবে তুমি যাহা চাও তাই যেন পাও
আমি যত দুঃখ পাই গো..."


দত্তবাড়ির দোতলার কোণার ঘরে সেদিন আর কেউ ছিল না। পূর্বাশা গালে হাত দিয়ে মাথা নীচু করে শুনেছিল গান টা।গানের প্রত্যেকে টা কথা, স্ট্রিং এর প্রত্যেকটা টান, পূর্বাশার ভিতরটা কাঁপিয়ে দিয়েছিল সেদিন। সেই দিনটার কথা মনে করলে আজও ভেতর ফাঁকা হয়ে যায় তার । 


সঞ্জয় সেদিন থেকে যাওয়ার জন্য পূর্বাশাকে একটা কথাও বলেনি। ও গল্প বলেছিল। ওর ছেলেবেলার। ওর বেড়ে ওঠার। ওর মায়ের খুব ছোটবেলায় চলে যাওয়ার। বাবার ওকে বড়ো করার। ওই দত্তবাড়ির। কত কত গল্প। দিনের সূর্য কখন যে গাঙের জলে লালচে লজ্জায় ডুব দিয়েছিল খেয়ালই ছিল না। পূর্বাশার চলে যাওয়ার আগে মনে হয়েছিল, এই একটাদিনেই সে আস্ত একটা জীবন কাটিয়ে ফেলেছে। 

সৌমিক এসে নাড়া দিল….


-- "কি হল টা কি! আশ্চর্য তো ! যাওনা... তাড়াতাড়ি চেঞ্জ করে এসো। আমার বেশিক্ষণ ওয়েট করতে ভালো লাগছে না।" 

পূর্বাশা চোখ মুছল। হাতের ড্রেসটা নিয়ে উঠে গেল বাথরুমে। কিছুক্ষণ পর ফিরে এলো প্রস্তুত হয়ে। সৌমিক ততক্ষণে বিছানা পরিষ্কার করে,তৈরি হয়ে বসে আছে। পূর্বাশা পুতুলের মতো বিছানায় এসে বসল। অবচেতন মনে ভাবল…..

-- "এই পৃথিবীতে সঞ্জয়ের মত ছেলেও আছে, সৌমিকের মত ছেলেও আছে। কেউ ভালোবাসার প্রত্যেকটা স্পর্শ মনের মধ্যে পৌঁছে দিতে শুধু কইয়েকটা কথা বলে,আর কেউ শরীর নগ্ন হবার আগেই চরিত্র নগ্ন করে দিতে একবারের বেশি দুবার ভাবেনা। কেউ একটা মেয়েকে  "ভালোবাসা" দিয়ে "ভালো" "বাসা" বানানোর স্বপ্ন দেখে আর কেউ মেয়ে মানুষ বলতে শুধু একটা শরীর বোঝে। "

পূর্বাশা কল্পনার জগত থেকেই অনুভব করল একটা হিংস্র দানব ওর শরীরটাকে তখন নিংড়ে নিচ্ছে। তার প্রতিটা আঘাতে খিদে আছে,ভালোবাসা নেই। পূর্বাশা চোখ বন্ধ করে নিল। চোখের সামনে তখন সে দেখতে পাচ্ছে, একটা ছেলে তার দুর্মূল্য দুটো চোখে তার দিকে তাকিয়ে হাতে গিটার টা নিয়ে গেয়ে চলেছে…..
               
        
BENGALI LOVE STORY - ' মনের আয়না ' BENGALI LOVE STORY - ' মনের আয়না ' Reviewed by Bengali love status on April 25, 2020 Rating: 5

No comments:

Powered by Blogger.